Saturday, November 19, 2016

দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে স্বর্ণার পরিবর্তে ব্রি-ধান ৩৪ এখন আবাদ হচ্ছে ব্যাপকভাবে

রাইসুল ইসলাম, পার্বতীপুর (দিনাজপুর)
চলতি বছর আমন মৌসুমে দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে বিস্তীর্ন এলাকায় ব্রি-ধান ৩৪, বিআর ৫, জিরা ভোগ ও বাদশা ভোগ জাতের ধান কৃষকেরা চাষ করেছেন। এসব জমিতে ইতিপূর্বে চাষীরা রোগবালাই অসহনশীন ভারতীয় স্বর্ণা ধানের চাষ করতেন। স্বর্ণা ধান চাষ করার কারনে দেশী জাতগুলি বেশি পরিমানে রোগ বাইলায়ের কবলে পড়তো। এরফলে ফলন কম হতো। এছাড়াও অনেক জায়গায় ধানের জীব বৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছিল বলে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। 
চলতি আমন মৌসুমে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর, দিনাজপুর সদর, চিরিরবন্দর, ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, বিরল এবং রংপুর জেলার তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জসহ অন্যান্য উপজেলার বিস্তীর্ন এলাকায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত ব্রি-ধান ৩৪, বি আর ৫সহ স্থানীয় জাতের সুগন্ধি ধান কৃষকের জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে ও মৌ মৌ সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। 
কৃষি বিভাগ সংশিলষ্ট সূত্র জানায়, অনেক এলাকায় ব্রি’র এই জাতগুলো স্বর্ণা ধানের স্থলে ৬০ ভাগ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত প্রতিস্থাপিত হয়েছে। 
পার্বতীপুর উপজেলার ৮ নম্বর হাবড়া ইউনিয়নের কৃষক মোঃ মহসীন আলী ও ঢাকুলা গ্রামের হাবিবুর রহমানের সাথে কথা বলে জানা গেল, এ বছর তারা শতকরা ৮০ ভাগ জমিতে ব্রি- ৩৪ জাতের ধান চাষ করেছেন। আগে এসব জমিতে ভারতীয় স্বর্ণা আবাদ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উভয়ে বলেন, ব্রি-ধান ৩৪ এর চাল সুগন্ধযুক্ত, পোলাও এর জন্য খুবই সুন্দর, দাম বেশি এবং ফলন অনেক ভাল হওয়ায় কৃষকেরা এ জাতটি চাষাবাদে ঝুঁকে পড়েছেন। তাছাড়া রোগ বলাই না হওয়াও একটি প্রধান কারন বলে তারা জানান। ব্রি-ধান ৩৪ এর ব্যপারে দিনাজপুর সদর উপজলার পুলহাটের বিশিষ্ট চাল ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সুগন্ধিযুক্ত ও চিকন চাল প্রচুর পরিমানে বিদেশে রফতানি হচ্ছে। বাজারে এ ধানের চাহিদা ও দাম দুটোই বেশি। 
ব্রি-ধান ৩৪ সম্পর্কে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউ (ব্রি) রংপুর অঞ্চলের প্রধান ডঃ মোঃ আবু বকর সিদ্দিক সরকার জানান, ভারতীয় স্বর্ণা ধানের জায়গায় ব্রি-ধান ৩৪ প্রতিস্থাপনের বিষয়টি একটি যুগন্ত্রকারী ঘটনা। স্বর্ণা ধান খুবই রোগবালাই অসহনশীল হওয়ায় এ অঞ্চলে খোলপোড়া, পাতাপোড়া, ব্লাস্ট, ফলস স্মার্ট রোগ ও ধান থেকে এদেশীয় ধানের জাত বিআর ১১, ব্রি-ধান ৪৯ এ ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়। ফলে ধানের জীব বৈচিত্র হুমকির সম্মুখীন হচ্ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, সুগন্ধি চাল রফতানির জন্য সরকারের গৃহিত সিদ্ধান্ত কৃষকদের ব্রি-ধান ৩৪ আবাদে বেশি করে উদ্বুদ্ধ করেছে। ব্রি’র বিজ্ঞানীগণ ব্রি-ধান ৩৪, বিআর ৫ চাষাবাদের কৃষিতাত্বিক কলা কৌশল সহজভাবে কৃষকদের মাঝে উপস্থাপনা করে থাকেন। 
ডঃ আবু বকর সিদ্দিক আরও বলেন, ব্রি-ধান ৩৪ স্বল্প মাত্রার অলোক সংবেদনশীল হওয়ায় দেরীতে লাগালেও ভালো  ফলন পাওয়া যায়। এর জন্য রাসায়নিক সার খুব কম লাগে। ফলন হেক্টর প্রতি সাড়ে ৩ থেকে ৪ মেঃ টন পর্যন্ত হয়ে থাকে। 
তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে যশোর অঞ্চলের স্থানীয় খাসকানি নামক ধান থেকে বাছাইকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্রি-ধান ৩৪ উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ জাতের বৈশিষ্ট্য হলো, এর উচ্চতা ১১৭ সেন্টিমিটার, সুগন্ধি ও কালিজিরার মত ছোট ও পোলাও এর উপযোগী।
চিনিগুড়া, কালিজিরার মত সুগন্ধি হলেও ব্রি-ধান ৩৪ এর ফলন প্রায় দ্বিগুন হয়ে থাকে। এর জীবনকাল ১৩৫দিন। এর চাষাবাদ পদ্ধতি বীজতলায় বীজবপন ১০ থেকে ১৫ শ্রাবন (২৫-৩০ জুলাই), চারার বয়স ২৫-৩০দিন, রোপন দূরত্ব ২০ গুণন ১৫ সেন্টিমিটার। 
সার প্রয়োগ করতে হয় ইউরিয়া ২০ কেজি, টিএসপি ১৩ কেজি, এমপি ৯ কেজি, জিপসাম ৮ ও জিংক দেড় কেজি প্রতি বিঘায়। ইউরিয়া সার সমান ৩ কিস্তিতে জমি তৈরীর শেষ পর্যায়ে, রোপনের ২০ থেকে ২৫ দিন এবং ৪৫ দিন পর  প্রয়োগ করতে হয়। 
রোপনের পর ৩০ থেকে ৪০ দিন জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। চাল শক্ত না হওয়া পর্যন্ত সম্পূরক সেচ দিতে হয়। ব্রি-ধান ৩৪ এ টুংরো রোগের আক্রমনের আশংকা বেশি থাকে। রোগ বালাই দমনে অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। সবশেষে, ১০ থেকে ১৫ অগ্রহায়নের মধ্যে (২৫-৩০ নভেম্বর) ধান কাটা শেষ করতে হয় বলে ডঃ আবু বকর সিদ্দিক উল্লেখ করেন।

শেয়ার করুন

0 facebook: